ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
* জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে সুন্দরবনসহ নিম্নাঞ্চল * মহাবিপদ সংকেতেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন না উপকূলবাসী * চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ

রেমালের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত উপকূল

  • আপলোড সময় : ২৬-০৫-২০২৪ ১০:৪১:৩০ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৭-০৫-২০২৪ ০৯:৫৮:৫৯ পূর্বাহ্ন
রেমালের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত উপকূল বাগেরহাটের মোংলায় যাত্রীবাহী একটি নৌকা ডুবে গেছে। ওই নৌকায় ৫০ থেকে ৬০ জন যাত্রী ছিল। মোংলা নদীর ঘাটে অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে নৌকা ডুবে যায়
প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চল। শত শত গাছ উপড়ে পড়েছে। বহু ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে পড়েছে। জোয়ারের পানিতে নিঝুমদ্বীপ, মহেশখালী, রাঙ্গাবালী, বরগুনার পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল ও রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে এবং বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। বহু মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। ভেঙে পড়েছে মোবাইল টাওয়ার। উপকূলী অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ সচিবালয়ে সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জানা গেছে, সাতক্ষীরা ও খেপুপাড়া উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় রেমালের অগ্রভাব। এর ফলে ঝোড়ো বাতাস ও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টার পরবর্তী তিন থেকে চার ঘণ্টা অর্থাৎ রাত ৯-১০টার দিকে এর কেন্দ্র উপকূল অতিক্রম করেছে। এসময় ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডব দেখেছে উপকূলবাসী।
সাতক্ষীরা উপকূলে প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ছে বেড়িবাঁধের ওপর। বাঁধের কিছু অংশ ধসে পানি ঢুকেছে আশপাশের গ্রামগুলোতে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬২ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। এর ফলে উপকূলে ৮-১২ ফুট জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা রয়েছে। সাতক্ষীরায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। জেলা শহরে হালকা বৃষ্টি হলেও শ্যামনগর ও আশাশুনি এলাকায় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। এর আগে সকাল থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন চুনা, খোলপেটুয়া, মাংলঞ্চ ও যমুনা নদী ও কপোতাক্ষ নদে স্বাভাবিক জোয়ার তুলনায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি, দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা, পদ্মপুকুর, আটুলিয়া, কৈখালী, রমজাননগর, মুন্সিগঞ্জ উপকূলীয় এলাকায় মাঝারি বৃষ্টির পাশাপাশি ঝোড়ো বাতাস বইছে। লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ও ঝূকিপূর্ণ গ্রামগুলোর মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিপিপি, সিডিওর সহায়তা নিয়ে মাইকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে শ্যামনগর উপকূলে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ায় তা সংস্কার শুরু করেছেন স্থানীয়রা। গাবুরার ডুমুরিয়া এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঝোড়ো বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া বইছে। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে বাঁধ ধসে লোকালয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। চাঁদনিমুখা এলাকায় নদীর পানি বেড়ে বাঁধ ধসে আশপাশের গ্রামে ঢুকছে। গাবুরার ৯ নম্বর সোরা, হরিষখালি এবং গাবুরার ২ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। জলোচ্ছ্বাস পুরো দমে শুরু হলে এই ইউনিয়ন পানিতে ডুবে যাবে।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, রেমালের আঘাতে আমার ইউনিয়নের দুই পাশের খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের পানি বেড়ে লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বাঁধ ধসে গেছে। ধসে যাওয়া অংশে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস হলে আমার ইউনিয়নের মানুষের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। পুরো ইউনিয়ন ডুবে যাবে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সালাউদ্দীন বলেন, স্বাভাবিকের তুলনায় পানি বেড়েছে পাঁচ-ছয় ফুট। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও অশনির পর জেলার অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার করা হয়েছে। অতিরিক্ত জোয়ারের পানি যাতে লোকালয়ে ঢুকতে না পারে সেজন্য আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। পাঁচ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ আছে। যেসব জায়গায় সংস্কারের কাজ চলছে। এছাড়া আমরা পর্যাপ্ত জিওব্যাগ মজুত করে রেখেছি।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি আছে উল্লেখ করে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি আছে। উপকূলীয় শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও দেবহাটা এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষকে আনার জন্য স্বেচ্ছাসেবক টিমের ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। এছাড়া পুলিশ, নৌবাহিনী, বিজিবি, গ্রাম পুলিশ মানুষকে আশ্রয়কেন্দে নিয়ে আসছেন। মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত ও পর্যাপ্ত খাবার মজুত রাখা হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, রোববার সকালের দিকে ঘূর্ণিঝড়টির এগোনোর গতি ছিল ঘণ্টায় ৬ কিলোমিটার, বিকেলে সেটি ১৩ কিলোমিটার বেগে এগোচ্ছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি মোংলার কাছ দিয়ে ভারতের সাগর আইল্যান্ড (পশ্চিমবঙ্গ) ও খেপুপাড়া উপকূল অতিক্রম করে। প্রবল ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রবর্তী অংশ ও বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৮-১২ ফুটের বেশি উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানায়, ঘূর্ণিঝড় রেমালের অগ্রভাগ বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম শুরু করে গতকাল রোববার সন্ধ্যায়। যা পরবর্তী ৩-৪ ঘণ্টায় মোংলার কাছ দিয়ে খেপুপাড়া উপকূল অতিক্রম করেছে। তবে কেন্দ্র অতিক্রম করলে ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব শেষ হবে না।
গতকাল রোববার দুপুরে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্র ও পর্যটন স্পটের ওসি আজাদ কবির জানান, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে চার ফুট পানি বেড়ে সুন্দরবন তলিয়ে গেছে। পানির চাপ আরও বাড়বে। তবে বন্যপ্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির কোনও আশঙ্কা নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। আজাদ কবির বলেন, ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পুরো সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। বন বিভাগের ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে থাকা বনরক্ষীদের এরইমধ্যে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে এরইমধ্যে মোংলা নদীতে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান পৌর মেয়র শেখ আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ঝুঁকি এড়াতে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে জরুরি কাজ ও রোগীদের কথা চিন্তা করে মোংলা নদীতে ফেরি চালু রাখা হয়েছে। পৌর শহরের আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজনকে আনতে ব্যাপক তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউনুস আলী বলেন, বন্দর কিল্লা, নামার বাজার, ইসলামপুর ও মোল্লা গ্রামসহ পুরো নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন পানিতে প্লাবিত হয়েছে। মানুষজন ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। পানিতে ভেসে গেছে গবাদিপশুর খাদ্য ও মাছের ঘের। তলিয়ে গেছে শাকসবজিসহ নানা ফসলের জমি। নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কেফায়েত হোসেন বলেন, অস্বাভাবিক জোয়ারের ফলে মেঘনা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। বেড়িবাঁধ না থাকায় নিঝুমদ্বীপের সব তলিয়ে গেছে। আমার বিভিন্ন কৃষি জমিসহ লাখ লাখ টাকার ফসল তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে গেছে পুরো ইউনিয়নের ৫০ হাজার বাসিন্দা। নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. দিনাজ উদ্দিন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ নেই তাই সকাল থেকে এখানে জোয়ারের পানি উঠেছে। বিকেলেও জোয়ার কেবল বাড়ছেই। মানুষ পানিবন্দির পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকটে পড়েছে। রাস্তাঘাট সব তলিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে নিঝুমদ্বীপের সকল ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুভাশিষ চাকমা বলেন, জোয়ার এখনো চলমান আছে। আমরা এই মুহূর্তে ক্ষতির পরিমাণ বলতে পারছি না।  নিঝুমদ্বীপের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা খোঁজখবর রাখছি। কোথাও কোনো ক্ষতি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে । এদিকে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার উপকূলের বাসিন্দাদের কেউ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। তারা বলছেন আরও পরে যাবেন। গতকাল রোববার দুপুর ১টার দিকে বলেশ্বর নদীর রায়েন্দা বেড়িবাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাইকিং করে উপকূলবাসীকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। তবে দুপুর গড়ালেও বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। বেড়িবাঁধ এলাকার বাসিন্দা সেতারা বেগম বলেন, এ ধরনের বিপদ সংকেত মাঝেমধ্যেই আসে, তাই এখন আর তেমন ভয় লাগে না। সবকিছু গুছিয়ে রেখেছি, যদি ঝড় আসে তখন আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাব। জাহানারা বেগম নামে আরেকজন বলেন, ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করে মাইকিং করে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলেছে। শুনেছি ঘূর্ণিঝড়টি রাতে আসবে, তাই এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে যাইনি। বিকেলের দিকে যদি ঝড় বেশি দেখি তাহলে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাব।
রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য জালাল উদ্দিন রুমি বলেন, সংকেত পাওয়া মাত্র এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টি সম্ভবত সন্ধ্যার দিকে আঘাত হানবে, এজন্য এলাকাবাসী একটু দেরি করে আশ্রয় কেন্দ্রে যাচ্ছেন। ঝড় শুরু হলে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আমরা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় অবস্থান করব।
শরণখোলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রায়হান উদ্দিন শান্ত বলেন, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের উপজেলাটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় প্রতিটা ঘূর্ণিঝড়েই এখানকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। ঘূর্ণিঝড় রেমালে যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয় সে লক্ষ্যে আমরা প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। উপজেলায় মোট ৯০টি আশ্রয়কেন্দ্র পরিষ্কার করা হয়েছে। সকলে যাতে আশ্রয়কেন্দ্রে আসে সেজন্য মাইকিং করা হচ্ছে। শুকনো খাবার, ওষুধ ও খাবার পানি মজুদ রাখা হয়েছে। আশা করি বিকেলের মধ্যে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে পারব।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. খালিদ হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবিলায় জেলায় মোট ৩৫৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। সবাই যেন আশ্রয়কেন্দ্রে যায় সেজন্য মাইকিং করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় রিমাল বরিশালের পায়রা সমুদ্রবন্দরের আরও নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থান করছে। রিমালের প্রভাবে ইতোমধ্যে বরিশালে বৃষ্টি, বাতাসের তীব্রতা বেড়েছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে বরিশাল বিমানবন্দর থেকে সকল ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরিশাল বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের দক্ষিণ চরমোন্তাজ নয়ারচর এলাকায় গ্রামরক্ষা বাঁধ অতিক্রম করে গ্রামের মধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে বউবাজার, নয়ারচর, দক্ষিণ চরমোন্তাজ, উত্তর চরমোন্তাজ, মোল্লাগ্রাম ও চর আণ্ডাসহ প্রায় ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের গ্রামরক্ষা বাঁধের একাধিক জায়গা থেকে পানি প্রবেশ করায় গরুভাঙ্গা, চরলতা ও চিনাবুনিয়াসহ আরও কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, জেলায় ১৩০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১৪ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এরমধ্যে দেড় কিলোমিটার বাঁধ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। ভাঙন মেরামতের জন্য ১৬ হাজার জিও ব্যাগ প্রস্তুত রয়েছে।
এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজানুর রহমান বলেন, চালিতাবুনিয়ায় আগেই বেড়িবাঁধ ভাঙা ছিল। গতকাল রোববার জোয়ারের পানিতে চরমন্তাজের অনেক জায়গায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত। এ কারণে ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেশিরভাগ জায়গা প্লাবিত হয়েছে। আমরা পানিবন্দিদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ঘূর্ণিঝড় রিমাল সন্ধ্যা নাগাদ বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম শুরু করতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বর্তমানে পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকায় ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত জারি রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে উঁচু জোয়ারের চাপে বরগুনায় বেড়িবাঁধ ভেঙে পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জোয়ারের পানি বেড়ে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভেসে গেছে পুকুর ও ঘেরের মাছ। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন এসব গ্রামের বাসিন্দারা। এর মধ্যে আমতলী উপজেলার আড়পাংগাশিয়া ইউনিয়নের পশরবুনিয়া এলাকায় তিনটি ও সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের ডালভাঙ্গা এলাকায় দুটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের ডালভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মকবুল হোসেন জানান, নদীর তীরে আমার বাড়ি হাওয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে আমাদের এখানে উত্তর ডালভাঙ্গা এবং মাছখালি গ্রাম তলিয়ে গেছে। এসব গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
পশরবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আফজাল সিকদার বলেন, আগে থেকেই আমাদের এখানকার বেড়িবাঁধটির অবস্থা নাজুক। রিমালের প্রভাবে বৃষ্টির হওয়ায় বাঁধ ভিজে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জোয়ারের পানির চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। সরকারি স্কুলে যাচ্ছি রাত কাটানোর জন্য। এ বিষয়ে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, আগে থেকেই বরগুনার পাঁচটি স্থান থেকে দেড় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেই ভেঙে যাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত করবো।

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স